হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য ধানের গোলা

হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য ধানের গোলা

বেঙ্গল রিপোর্ট২৪:
হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য ধানের গোলা। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় এক সময় গ্রামে গ্রামে ছিল ঐতিহ্যবাহী ধানের গোলা।

ধানের মৌসুমে কৃষকরা বুক ভরা আশা নিয়ে সোনার ফসল তুলতো এই গোলায়। প্রয়োজনের সময় গোলা থেকে ধান বের করে রোদে শুকিয়ে ভাঙ্গানো হতো। সারা বছর ধান ও চাল সংরক্ষণ করতে গোলা খুবই উপযোগী। কিন্তু বর্তমানে গ্রামাঞ্চলের এই ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক হারিয়ে যেতে বসেছে।

মাঠের পর মাঠ ধানক্ষেত থাকলেও অধিকাংশ কৃষকের বাড়িতে নেই ধান মজুদ করে রাখার বাঁশ-বেত ও কাদা দিয়ে তৈরি গোলাঘর। যুগের হাওয়া পাল্টেছে পাল্টেছে সারা বছরের জন্যে ধান সংরক্ষণের ধরণও। দু‘চার জন বড় গৃহস্থ ছাড়া ছোট খাটো কৃষকেররা এখন আর ধান মজুদ করে রাখেন না। গ্রাম বাংলার প্রবাদ বাক্যটি গোয়াল ভরা গরু, গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ” এ যেন বর্তমান প্রজন্মের কাছে কালজয়ী কোনো উপন্যাস।

এক সময় যা বাস্তবে ছিল, আজ তা প্রায় বিলুপ্তির পথে।এই উপজেলার প্রায় প্রত্যেক পরিবারে বাঁশ দিয়ে চটা তৈরি করে সেটাকে গোলাকার আকৃতির ধানের গোলা তৈরী করে বাড়ির উঠানে উচুঁ ভীত বানিয়ে সেখানে বসানো হতো। আর সেটার ছাউনি হিসেবে খড়, গোলপাতা এবং টিন ব্যবহার করা হতো। ছাউনির উপরের দিকে বেশ উচুঁ টিনের পিরামিড আকৃতির হতো যা অনেক দূর থেকে দেখা যেত।

ইদুঁর জাতীয় প্রাণী এবং বর্ষার পানি থেকে রক্ষা করে ফসল সংরক্ষনের জন্য গোলা ছিল ব্যাপক জনপ্রিয় এবং কার্যকর। একটি বড় গোলায় ৪০ থেকে ৫০ মণ আর একটি ছোট গোলায় ২০ থেকে ৩০মণ ধান সংরক্ষণ করা যেতো। আর যে সকল পরিবারের গোলা তৈরি করার সামর্থ থাকত না তাদের প্রায় প্রত্যেকের বাড়িতে থাকত গোলার মতো ছোট আকৃতির আউড়। আউড় বসানো হতো ঘরের মধ্যে।

কম খরচে বেশি পরিমাণে শস্য সংরক্ষণের গোলার বিকল্প কিছুই নেই। কালের আর্বতনে গ্রামাঞ্চলের মানুষের ঐতিহ্য গোলা ও আউড় এখন খুবই কম দেখা মেলে। বর্তমান সময়ে গ্রামাঞ্চলে যেটুকু শস্য উৎপাদিত হয় সেগুলো বিক্রি করে চাউল কিনে খাওয়ার প্রবণতাই বেশি দেখা যায়। আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রাম বাংলার মানুষের চাল-চিত্র উলট-পালট করে দিয়েছে বলে সর্ব মহলের ধারণা।

এছাড়াও রূপগঞ্জে আধুনিক ঢাকার আদলে উপশহরের কাজ শুরু হওয়ায় গোটা রূপগঞ্জে হাউজিং কোম্পানী গুলো হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। ভরাট করে ফেলছে ধানী জমিসহ জলাশয়। ধানের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। তাই ধানের গোলার ব্যবহারও কমে যাচ্ছে। তাছাড়া বর্তমানে ধান চাষেও আগ্রহী নন কৃষকেরা,যার ফলে ধানের গোলার এখন আর আগের মতো কদর নাই। সাম্প্রতিক কালে রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও আধুনিক কলের লাঙ্গল যেন উল্টে-পাল্টে দিয়েছে গ্রাম অঞ্চলের চালচিত্র। আর একের পর এক ফসলি জমি মৎস্য চাষে ব্যবহৃত হওয়ায় কৃষি জমির সংখ্যা কমে গেছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

আগেকার সময় ছেলে-মেয়ে বিয়ের জন্য পাত্র বা পাত্রী পক্ষের সম্পদের মাপকাঠি ধরা হতো বাড়িতে গোলা বা আউড়ের পরিমাণের উপর নির্ভর করতো। বর্তমানে কন্যা পাত্রস্থ করতে পিতা ভাবে ছেলের সরকারি চাকুরি কিংবা বড় ধরণের কোন ব্যবসা আছে কিনা? এদিকে, গোলা নির্মাণ করার জন্য বিভিন্ন এলাকায় আগে দক্ষ শ্রমিক ছিল, গোলার চাহিদা কমে যাওয়ায় গোলা তৈরির অনেক কারিগর তাদের পূর্বপুরুষের পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় নিযুক্ত হয়েছেন। ফলে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী ধানের গোলা আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

এখন আর দেশের বিভিন্ন জেলায় শহর থেকে আসা গোলা নির্মাণ শ্রমিকদের দেখা মিলে না। ভোলাব ইউনিয়নের গুতুলিয়া এলাকার ফটিক সরকার জানান, এখন গোলার প্রচলন প্রায় উঠে গেছে বললেও ভূল হবে না। আমার বাড়িতে একটি গোলা আছে কিন্তু দীর্ঘ দিন সেটাকে ব্যবহার করা হয় না। কয়েক বছর পূর্বেও এলাকায় প্রায় প্রত্যেকের বাড়িতে কম বেশি গোলা থাকতো। সব কিছু মিলিয়ে গ্রাম বাংলার কৃষকের এক সময়ের সমৃদ্ধির প্রতীক ছিলো এ গোলা যেটি আজ হারিয়ে যেতে বসেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন




Copyright © 2019 All rights reserved bengalreport24.com
Design BY NewsTheme