টনক নড়েছে কর্তৃপক্ষের, মদের বার বন্ধের নির্দেশ

বেঙ্গল রিপোর্ট
অবশেষে টনক নড়েছে কর্তৃপক্ষের। কঠোর আল্টিমেটাম দিয়ে নগরীর বহুল আলোচিত ব্লু পিয়ার রেস্টুরেন্ট (মদের বার) বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর।

বুধবার দুপুরের দিকে ঢাকা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ডিজি জামাল উদ্দিন বার পরিদর্শনে এসে বার বন্ধের নির্দেশ দিয়ে একটি নোটিশ টানিয়ে দিয়ে যান। তবে, এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক সামসুল আলমকে একাধিকবার কল করলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। ফলে এ প্রসঙ্গে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।এর আগে ব্লু পিয়ার বার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়।

জানা গেছে, শহরের ভাষা সৈনিক সড়ক যেটা বালুরমাট হিসেবে পরিচিত সেখানে রয়েছে প্যারাডাইজ ক্যাবলস গ্রুপের মালিকানাধীন বহুতল প্যারাডাইজ ক্যাসেল ভবন। ভবনের ৯, ১০ ও ১১ তলায় তিনটি ফ্লোর ৪০ লাখ টাকা অ্যাডভান্সে ভাড়া নিয়ে ‘ব্লু পিয়ার’ নামক একটি সুসজ্জিত রেস্টুরেন্ট (বার) ডেকোরেশনের কাজ সম্পন্ন করেন এর মালিক গাজী মুক্তার। প্যারাডাইজের পক্ষে ভাড়া দিয়েছেন মোবারক হোসেন।

সূত্রে জানা গেছে, ২৯ জানুয়ারী উদ্বোধন করা হয় ব্লু পিয়ার নামক রেস্টুরেন্ট। উদ্বোধনের ৩ দিন দিনের মাথায় আনুষ্ঠানিকভাবেই মদ বিয়ার বিক্রি শুরু করে কর্তৃপক্ষ। তবে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারীর মধ্যে মদের বার বন্ধ করা না হলে নারায়ণগঞ্জের তৌহিদি জনতা বার উচ্ছেদ করে দিবে বলে হুশিয়ারি দিয়েছিলেন জেলা উলামায়ে পরিষদের সভাপতি আব্দুল আউয়াল।

ব্লু পিয়ার রেস্টুরেন্ট (মদের বার) উদ্বোধনের পূর্বেই নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রকাশিত দৈনিক সচেতন পত্রিকা সহ বেশ কয়েকটি সংবাদ মাধ্যম আশংকা প্রকাশ করে একাধিক সংবাদ প্রকাশ করেছে। সেই সময় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে বারের অনুমোদনের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা বরাবরই বারের অনুমোদন প্রদান করা হয়নি বলে জানিয়েছিলেন। তবে ব্লু পেয়ার রেস্টুরেন্ট (মদের বার) উদ্বোধন হওয়ার পরই নারায়ণগঞ্জের সংমাধ্যমের কাছে বারটির অনুমোদনের একটি কপি এসে পৌছে যাতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর নির্দিষ্ট পরিমান মদ বিক্রি ও বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়ে লাইসেন্স প্রদান করেছেন।

অপর দিকে বারটির প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জ-৪ ও ৫ আসনের সংসদ সদস্য এ.কে.এম শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমান দৈনিক সচেতন পত্রিকায় তাদের আশংকা প্রকাশ করে বক্তব্য প্রদান করেছিলেন। সাংসদ সেলিম ওসমান আশংকা প্রকাশ করে বলেছিলেন, যেখানে নারায়ণগঞ্জ ক্লাব বেকআপ দিচ্ছে সেখানে আরেকটি বারের কোন প্রয়োজন নেই। শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বারটি হলে নারায়ণগঞ্জে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে এবং সাংসদ শামীম ওসমান বলেছিলেন, একটি মসজিদের পাশে মদের বার কোন ভাবেই কাম্য নয়।

ব্লু পিয়ার রেস্টুরেন্ট (মদের বার) এর প্রধান নির্বাহী গাজী মোক্তার হোসেন বলেছিলেন, বারের বিষয়টি মিথ্যা প্রচারণা। এটি একটি রেস্টুরেন্ট। বার করার চিন্তাভাবনা তাদের নেই। সাংবাদিকদের ফাঁকি দেওয়ার কিছু নাই। একটি ভালো মানের রেস্টুরেন্ট করেছি নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য। এখানে অনেক বিদেশী ক্রেতা থাকেন। তাদের জন্য বিশ্বমানের খাবার থাকবে এই রেস্টুরেন্টে।

তবে ফেব্রুয়ারীর শুরু হতেই আনুষ্ঠানিকভাবেই মদ বিয়ার বিক্রি শুরু হয়। এ নিয়ে একের পর এক সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি আলেম ওলামারাও এ নিয়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। ৭ ফেব্রুয়ারী জুমআর নামাজ শেষে ডিআইটি রেল কলোনী জামে মসজিদের সামনে গণ সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে আবদুল আউয়াল ৭ দিনের সময় বেধে দিয়েছিলেন। বন্ধ না হওয়ায় ঘোষণা অনুযায়ী আগামী শুক্রবার ১৪ ফেব্রুয়ারীর কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়েছিল।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সূত্র মতে, নারায়ণগঞ্জ জেলায় মদ পান করার জন্য অনুমোদন রয়েছে সাড়ে ৮শ’ জন মুসলিম ও অমুসলিম ব্যক্তির। এছাড়াও সুইপার রয়েছেন ৫শতাধিক ব্যক্তি। বিদেশী রয়েছেন সাড়ে ৬শ’ জনের মতো। নন মুসলিম ব্যক্তিদের পারমিট বা অনুমোদন প্রাপ্তির জন্য আবেদনকারীকে ব্যাংকে নির্দিষ্ট অংকের টাকার চালান জমা দিতে হয়। সঙ্গে লাগে ডাক্তারের সনদ। যাদের লাইন্সেস রয়েছে তাদের একজন প্রতিমাসে সাড়ে ৭ লিটার মদ ক্রয় করতে পারবেন। এজন্য মদপানকারী ব্যক্তির কাছে থাকা অনুমোদনের কার্ডে ও কোম্পানির রেজিস্ট্রেশন কার্ডে তা লিপিবদ্ধ করতে হবে।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ রেস্টুরেন্ট কাম বারের প্রচারণার জন্য নারায়ণগঞ্জের যেসব এলাকাতে বিদেশীরা বসবাস করছেন তাদের কাছে লিফলেট পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এছাড়াও বারের সদস্য ফি ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করেও চালানো হচ্ছে প্রচারণা। ওই বারের সদস্য হলে তাকে যেমন ব্লু পিয়ার কর্তৃপক্ষ মদ সেবনের পারমিট করে দিবে তেমনি সদস্য কার্ড থাকলে তার সঙ্গে অর্থ না থাকলেও কার্ড নম্বর অনুযায়ী তিনি নির্দিষ্ট অর্থের পরিমাণ মদ সেবন করতে পারবেন। কারণ দেখা যায় অনেক সময় মদ্যপ ব্যক্তি অতিরিক্ত মদ সেবনের কারণে সেন্সলেস (জ্ঞানহীন) হয়ে পড়েন। সেক্ষেত্রে যাতে টাকা নিয়ে কোন সমস্যা না হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখেই বিভিন্ন মহলে সদস্য হওয়ার প্রস্তাবনা দিচ্ছে ব্লু পিয়ার কর্তৃপক্ষ। এজন্য তারা বিভিন্ন এলিট শ্রেনীর বসবাসকারী এলাকায় এজেন্টও নিয়োগ দিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। বিশেষ করে শহর ও শহরতলীর অভিজাত এলাকাগুলোতে অনেকটা নিরবেই চলছে এ ধরনের প্রচারণা। পাশাপাশি যেসব এলাকাতে বিদেশীরা বসবাস করে বিশেষ করে ভূইগড়ের রূপায়ন টাউন, বিসিক শিল্পনগরী, আদমজী ইপিজেড, শিবুমার্কেট শিল্পাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকাতেও চলছে নিরবে প্রচারণা।

লাইসেন্স অনুযায়ী এ বারের ওয়্যার হাউজে সর্বোচ্চ ৫ হাজার লিটার মদ, বিয়ার, অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় রাখা যাবে। ওয়্যার হাউজের আয়তন ১১৪ বর্গফুট যার মধ্যে দৈর্ঘ্য ১৮ দশমিক ৭ ফুট ও প্রস্থ্য হবে ৬ দশমিক ১ ফুট। অনুমতি পত্রে এ পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে।

ওই পত্রে দেখা গেছে ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই মদের বারের অনুমোদন প্রদান করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এক বছর মেয়াদী এর লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হবে চলতি বছরের (২০২০) ৩০ জুন। ব্লু পিয়ার রেস্টুরেন্টের ৯তম তলায় বারটি চলবে লেখা আছে অনুমতি পত্রে। এতে আরো বলা হয়েছে, ৯ম তলায় ৪ হাজার ৩শ স্কয়ার ফুটের বারে ৮০টি আসন রাখা যাবে। বার প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা হতে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। ২১ বছরের কম কাউকে পানীয় পরিবেশন করা যাবে না।