করোনা মহামারি: স্কুলে ফিরবে কি দরিদ্র পরিবারের শিশুরা?

নাজিফা আনজুম প্রমি.

মহামারির আগে নিয়মিত স্কুলে যেতাম । স্বপ্ন দেখতাম পড়াশুনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াব । বাবা-মার মুখ উজ্জ্বল করব”- কথাগুল বলছিল পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া থানার বুখাইতলা বান্দপপাড়া গ্রামের মেয়ে সুমাইয়া(ছদ্মনাম)।সুমাইয়া(১৫) গ্রামের বি.বি.এস ম্যাধ্মিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেনিতে পড়ত । তার ইচ্ছা ছিল স্কুলের শিক্ষক হওয়ার ।কিন্তু গত বছর করোনা ভাইরাস এর প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই তার বিয়ে হয়ে যায় ।পাত্র প্রবাসী ,পরিবারে কোন অভাব-অনটন নেই , তাছাড়া

স্কুল বন্ধ কবে খুলবে এর কোন নিশ্চয়তা নেই এরকম নানা অজুহাত দেখিয়ে সুমাইয়াকে বিয়ে দিয়ে দেয় তার পরিবার ।যদিও শর্ত ছিল বিয়ের পরেও সুমাইয়া তার পড়াশোনা চালিয়ে যাবে কিন্তু এখন তার শ্বশুর-শ্বাশুড়ি চায় না সে পড়াশুনা করুক । সুমাইয়া আফসোস করে বলে -“আমার অনেক বন্ধু অনলাইনে ক্লাস করে , আসাই্নমেন্ট জমা দেয় । কিন্তু আমি পারি না ।আমি ঘরের সব কাজ করি, রান্নাবান্না, ধোয়া-মোছা ,ঝাড় দেওয়া ,আমাকে সব কিছুই করতে হয়। বিয়ে না হলে হয়তো বা আমি আমার স্বপ্নগুলো পুরন করতে পারতাম ।

একই গ্রামের আরেক শিশু দুর্জয় (১৪)।সে ও তার পুরো পরিবার থাকত ঢাকার মোহাম্মদপুরে । দুর্জয় ঢাকারই একটি স্কুলে ৮ম শ্রেনিতে পড়ত ।তার বাবা একটি বেসরকারি কোম্পানিতে মালপত্র আনা-নেওয়ার জন্য গাড়িচালক হিসেবে্ কর্মরত ছিল। করোনা শুরু হলে তার বাবা চাকরিটি হারায়। এতে করে পরিবারের ভরণপোষণ চালাতে না পেরে দুর্জয়রা গ্রামে ফিরে আসেন । এরই মাঝে করোনাভাইরাস তাদের পরিবারে হানা দেয় , বাবা -মা সহ পরিবারের সবাই অসুস্থ হয়ে পরে। বাসায় তীব্র খাদ্র্য ও অর্থ সঙ্কট থাকায় শেষমেশ দুর্জয়ও কাজে নেমে পরে। শুরুতে সে ভ্যানচালক হিসেবে কাজ করলেও এখন সে রিক্সসাচালিয়ে জীবিকানির্বাহ করছে। স্কুলে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা আছে কিনা জানতে চাইলে, দুর্জয় জানায় স্কুল চালু হলে মনে হয় না আর যাওয়া হবে ।বাবা-মা নিয়ে খুব কষ্টে দিন পাড় করছি। এখন পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবা আমার জন্য বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই না।

করোনা মহামারির কারণে দেশে বাল্যবিবাহ, শিশু শ্রম , স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার মারাত্মকভাবে

বৃদ্ধি পাচ্ছে । লকডাউনের কারণে দরিদ্র পরিবারগুলোর জীবন-জীবিকা কমে যাওয়ায় পরিবারের উপর নির্ভরতা কমাতে অনেকে তাদের মেয়েদের অল্প বয়সেই বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে । এবং ছেলেদের রোজগারের জন্য শিশু শ্রমে নিয়োগ করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় স্কুল বন্ধ থাকার কারনে, সমাজে এরকম প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে এবং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় রুপ নিচ্ছে । এ বছরের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত এডুকেশন ওয়াচের অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন ২০২১-এ ঝরে পড়ার ব্যাপারে উদ্বেগজনক মতামত পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিকের ৩৮ শতাংশ শিক্ষক মনে করেন বিদ্যালয় খুলে দেওয়ার পরও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যেতে পারে।

২০ শতাংশ মনে করেন, ঝরে পড়ার হার বাড়বে এবং ৮.৭ শতাংশ মনে করেন, শিক্ষার্থীরা শিশুশ্রমে নিযুক্ত হতে পারে। মাধ্যমিকের ৪১.২ শতাংশ শিক্ষক মনে করেন, বেশি শিক্ষার্থী ক্লাসে অনুপস্থিত থাকতে পারে। ২৯ শতাংশ মনে করেন, ঝরে পড়ার হার বাড়বে। এছাড়াও ৪৭ শতাংশ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মনে করেন, শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতের হার বাড়বে, ৩৩.৩ শতাংশ মনে করেন ঝরে পড়া বাড়বে এবং ২০ শতাংশ মনে করেন, অনেকেই শিশুশ্রমে যুক্ত হতে পারে। ৬৪ শতাংশ এনজিও কর্মকর্তা মনে করেন, শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির হার ও ঝরে পড়া বাড়বে।

সম্প্রতি জাতিসংঘ শিশু তহবিল ইউনিসেফ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মহামারির পুরোটা সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ফলে প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চতর শিক্ষার স্তর পর্যন্ত ৪ কোটিরও বেশি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যত বেশি সময় ধরে শিশুরা স্কুলের বাইরে থাকবে, সহিংসতা, শিশুশ্রম এবং শিশুবিয়ের ঝুঁকির সম্মুখীন হওয়ায় ততই তাদের স্কুলে ফিরে আসার সম্ভাবনা কমে যাবে।

যদিও বিশ্বব্যাপী দেশগুলো দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে শিক্ষা প্রদানের জন্য কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে, তবে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের কমপক্ষে ২৯ শতাংশের কাছে এই শিক্ষা পৌঁছানো যাচ্ছে না। যেখানে বাংলাদেশের, প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে ৭ জন শিশুই দূরশিক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পায়না। বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি টোমো হোযুমি বলেন, স্কুল এবং সশরীরে উপস্থিত হয়ে শিক্ষাগ্রহণ কার্যক্রম বন্ধ থাকা শিশুদের কেবল পড়াশোনার ক্ষেত্রে নয়, একইসঙ্গে তাদের স্বাস্থ্য, সুরক্ষা এবং মনস্তাত্ত্বিক সুস্থতার উপর অত্যন্ত গুরুতর প্রভাব ফেলে। প্রান্তিক শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, যা তাদেরকে অধিকতর দারিদ্র্য এবং অসমতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও দেবে। নিরাপদে স্কুল পুনরায় খুলে দেওয়া এবং সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের পড়াশোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিনিয়োগ করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের আজকের এই সিদ্ধান্ত এই শিশুদের পুরো জীবনকে প্রভাবিত করবে।

শিশুদের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গেলে অনেক উদ্বেগ প্রকাশ করেন, বরিশালের সাবেক জেলা শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা পঙ্কজ রায় চৌধুরি । তিনি বলেন-শিশুরা খুবই খারাপ সময় পার করছে।দেশে বাল্যবিয়ে,শিশুশ্রম এর মত সমস্যাগুল মহামারী আকার ধারণ করছে। দীর্ঘ দেড় বছর স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকার কারনে গ্রাম ও চর অঞ্চলের আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারগুল তাদের কন্যাশিশুদের জোর করে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। এছাড়াও করোনায় সৃষ্ট দারিদ্র্যতা বহু শিশুকে করেছে কর্মজীবী ।এবং এর ভয়াবহতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে । এরকম চলতে থাকলে তা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হুমকি বয়ে আনবে ।“পঙ্কজ রায় চৌধুরি বৈশ্বিক এই সমস্যা নিরসনে সবাইকে এক হয়ে কাজ করার পরামর্শ দিয়ে বলেন-“ ঝরে পড়ার হার কমাতে স্কুলগুল পুনারায় চালু করা ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই । বাল্যবিয়ের প্রতিরোধ মনিটরিং আরও জোরধার করে চালু করতে হবে। দরিদ্র পরিবারগুলোকে কাউন্সিলের আওতায় আনতে হবে, তাদের বুজাতে হবে বাল্যবিয়ে একটি মারাত্নক অপরাধ ও ব্যাধি । পাশাপাশি দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা , এনজিও গুল যদি একত্রে মাঠ পর্যায়ে কাজ করে তাহলে এ সমস্যা অনেকাংশই রোধ করা সম্ভব।