নূতন অশনী সংকেতঃ বজ্রপাত

নূতন অশনী সংকেতঃ বজ্রপাত

আবুল খায়ের
অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ন পরিচালক,পিএমও

অনাদি কাল হতেই বর্ষা মৌশুম শুরুর প্রাক্কালে কাল বৈশাখী ঝড়, শিলা বৃষ্ঠি আর বজ্রপাতের সাথে আকাশে বিজলী চমকানো এ অঞ্চলে হয়ে আসছে ৷ বন্যা আর ঝড়ের সাথে টিকে থাকার লড়াই বাংলার মানুষের সহজাত হয়ে গেছে ৷ কবি গুরু তার কবিতায় ‘ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে-‘বলে বৈশাখের তান্ডবে সতর্ক বানীও উচ্চারন করেছেন ৷ কিন্তু হালে বজ্রপাতে এত মানুষের মৃত্যু কখনো পরিলক্ষিত হয়নি এবং বজ্রপাতের সংখ্যায় এত ব্যাপক কখনো ছিল না ৷ সরকারী দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার হিসেব অনুযায়ী বিগত ২০১০ সন হতে অদ্যাবধি(১২/৫/১৮) বজ্রপাতে বাংলাদেশে মোট ১৪৭৬ জনের মৃত্যু ঘটেছে, তবে বেসরকারী তথ্যে সংখ্যাটি প্রায় ২০০০ ৷

গত এপ্রিল/১৮ মাসের শেষ দু’দিনেই বজ্রাঘাতে মৃতের সংখ্যা সরকারী তথ্য মতে ৫৮ জন যা আতংকজনকও বটে ৷ দূর্যোগ মন্ত্রনালয়ের Comprehensive Disaster Management Prog. এর হিসেব মতে গত দু’মাসে(১১/৫/১৮ পর্যন্ত) দেশের ২৬ জেলায় বজ্রাঘাতে ১৮০ জনের মৃত্যুর সংবাদ নিশ্চিত করেছে ৷ দুর্ভাগ্যজনকভাবে ক্ষেত-খামারে কর্মরত কৃষকগনই বজ্রপাতের শিকার হচ্ছে অধিক হারে ৷

হাওর-বাওরে অব্যাহতভাবে বজ্রাঘাতে কৃষি কাজে বা ধান কাটায় নিয়োজিতদের মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হতে শুরু করেছে ৷ বৃহত্তর সিলেট ও রংপুর অঞ্চলের হাওর এবং বিলাঞ্চলে বজ্রপাতের সংখ্যাধিক্যে মৃত্যুর সংখ্যা আশংকাজনক ভাবে বেড়েই চলেছে যা অতীতের সকল রেকর্ড অতিক্রম করেছে ইতোমধ্যে ৷ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের পশ্চিম বঙ্গ, বিহার, ঝাড়খান্ড, উত্তর প্রদেশ ও মহারাষ্ট্রেও বজ্রাঘাতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেই চলেছে এবং ভারতে ফি বছর কম-বেশী ২০০০ মানুষ মৃত্যু বরনও কর ৷

বজ্রপাতের সংখ্যা ও মৃত্যু-হার বৃদ্ধি নিয়ে নানা মুনী ও বিশেষজ্ঞের অভিমত বিভিন্নতর ৷ আবহাওয়াবিদদের মতে দক্ষিন দিক হতে আসা বায়ুতে উঞ্চ আদ্রতা উত্তরের শীতল বায়ূর সংস্পর্শে বজ্রের সূষ্ঠি হয় এবং তা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে ৷ যে যেভাবেই বিষয়টি মূল্যায়ন করুক না কেন, মূলে বৈশ্বিক আবহাওয়া পরিবর্তনটাই মূল অনুঘটক ৷

বিগত ২০১৪ সালে লন্ডনের University of Berkely এই বিষয়ে গবেষনায় বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিকে আবহাওয়ার গতি পরিবর্তনকে দায়ী করে বলা হয়েছে পৃথিবীর ঊষ্ণতা গড়ে ১ ডিগ্রী সেলসিয়াস বৃদ্ধিতে বজ্রপাতের সংখ্যা ন্যূনতম ১২% বৃদ্ধি পাবে ৷ মানুষের সভ্যতা আর শিল্পায়নের অদূরদর্শী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও অবিবেচক ভাবে বায়ূতে কার্বন নিঃসরনে মানুষই পৃথিবীকে উষ্ণ করে চলেছে নিয়তঃ৷ অপর দিকে বনাঞ্চল ধংস করে শিল্প বিপ্লবের নামে অবিবেচক ভাবে শিল্প-কারখানা স্থাপন, নগরায়নের নামে চলছে বন ভূমি উজার ৷ ঝড়-ঝঞ্ছা, শিলা বৃষ্ঠি, অকাল বন্যা, অতি বর্ষন, জলোচ্ছাস , এসিড বৃষ্ঠি, বজ্রপাত ভূ-পৃষ্ঠের উষ্ণতার সাথে সম্পর্কিত বিধায় প্রাকৃতিক দূর্যোগ ক্রমান্বয়ে বাড়বে বৈ, কমবে না এটা নিশ্চিত করেই বলা যায় ৷

সাধারন অপরিপক্ক জ্ঞানে এটা বিশ্বাস করা সংগত যে বাংলাদেশের হাওর ও বিলাঞ্চলে কখনো সুউচ্চ গাছের অস্থিত্ব ছিল না, এমনকি পাখীর বসার মত ছোট কোন বৃক্ষও ছিল না ৷ তাই বলে ঐসব অঞ্চলের কৃষককূল কখনো এমনতর বজ্রপাতে মৃত্যুর সন্মুখীন হয়নি নিকট অতীতেও ৷ তাল গাছ বা সুউচ্চ গাছ থাকলে বজ্রের আঘাতটা ওখানে পড়লে সমতলে অবস্থানরত মানুষ নিষ্কৃতি পেতে পারে বলে অনেক অভিজ্ঞ আবহাওয়াবিদের ধারনা ৷ সুউচ্চ গাছগুলো আর্থিং এর কাজ করে থাকে বলে দেশ ব্যাপী তালের চারা রোপনের উৎসব শুরু হয়েছে যা আগামী ২০-২৫ বছর পর কার্যকর উচ্চতা লাভ করবে বলে ধারনা করাই যায় ৷ কিন্তু এই মধ্যবর্তী সময়ে মানুষকে বজ্রপাত হতে বাঁচাতে বিকল্প পথ অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে ৷ এক্ষেত্রে আত্মরক্ষামূলক পদ্ধতিই শ্রেয়ঃ ৷

যুক্তরাজ্যের Royal Society for the Prevention of Accident বজ্রপাত হতে আত্মরক্ষায় ৫টি সুপারিশ ও পরামর্শ প্রদান করেছে ৷ পরামর্শ অনুযায়ী (১)বজ্রপাতের সময় বড় ও পাকা ভবন কিংবা গাড়িতে (নন আর্থিং বলে)দ্রুত আশ্রয় নিতে হবে ৷ (২) খোলা উন্মুক্ত স্থান বা উচুঁস্থান তথা পাহাড় হতে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সড়ে যেতে হবে ৷ (৩) বজ্রপাতের সময় ক্ষেতে-খামার থাকা কালীন বিকল্প উপায় না থাকলে শস্য-গাছ হতে ছোট হয়ে থাকার জন্য গুটি-সুটি হয়ে মাটিতে লুটিয়ে থাকতে হবে এবং কোন প্রকার লৌহজাত যন্ত্র ও মোবাইল ফোন সঙ্গে রাখা যাবে না ৷ (৪) কোন অবস্থাতেই বড় বা ছোট কোন গাছের নীচে আশ্রয় নেয়া যাবে না ৷ (৫) বজ্রপাতের সময় পানিতে থাকা অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বিধায় দ্রুত ডাঙ্গার নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে ৷ চলমান বজ্রপাত আতংকে উপরোক্ত সুপারিশ ও পরামর্শের উপর জনমত সৃষ্ঠি করা গেলে মৃত্যুর সংখ্যা হ্রাস করা সম্ভব বলে অনুমিত ৷ এক্ষেত্রে স্বল্প মেয়াদী জরুরী পদক্ষেপের মধ্যে হাওর ও বিল অঞ্চলে সুবিধাজনক স্থানে এবং দূরত্বে পাকা আশ্রয় কেন্দ্র নির্মানসহ স্বল্প খরচে প্রয়োজনীয়তার নিরিখে সুউচ্চ আর্থিং টাওয়ার নির্মান করা যেতে পারে ৷

এপ্রিল ও মে মাসে এদেশে কাল বৈশাখী ঝড় ও বজ্রপাতের সমুহ সম্ভাবনা থাকে বিধায় বজ্রপাতে আক্রান্ত জেলায় মানুষকে আত্মরক্ষায় সচেতন ও মাঠে-ময়দানে কৃষি কাজের সময় মোবাইল ফোন সঙ্গে না রাখার জন্য কৃষকদের পরামর্শ প্রদান করা ইতিবাচক হতে পারে ৷ বজ্রপাতের অগ্রীম তথ্য সংগ্রহের প্রযুক্তি সংগ্রহ ও স্থাপনসহ বেতার বা টেলিভিশনে আগাম সতর্কতা প্রচারের ব্যবস্থাও কার্যকরী হতে পারে ৷ হালে নগরীতেও কালবৈশাখী ঝড় ও বজ্রপাত জন-মনে যথেষ্ঠ আতংক সৃষ্ঠি করেছে ৷ পুরান ঢাকার অনেক পুরনো ভবনগুলোতে নীচের মাটি হতে তামার প্লেটে ছাদে ত্রিশূলাকৃতির আর্থিং ব্যবস্থা থাকলেও এখনকার আকাশচুম্বি ভবনে আর্থিং ব্যবস্থা দেখাই যায় না ৷ তবে মন্দের ভাল হিসেবে মুঠো ফোনের টাওয়ারগুলোতে শক্তিশালী আর্থিং ব্যবস্থা সংযুক্ত থাকায় এখনো বজ্রপাতে নগরীতে দুর্ঘটনা পরিলক্ষিত হয়নি ৷ তাই বলে অসতর্ক থাকাটাও কাম্য নয় ৷ বজ্রপাতে ঘরের বৈদ্যতিক ও ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্রপাতি অতিরিক্ত বিদ্যুতের ভোল্ট চলে আসায় নষ্ট হচ্ছে ৷ এক্ষেত্রে করণীয় বিষয়েও প্রচার মাধ্যমের সাহায্যে জন-সচেতনতা সৃষ্ঠির উদ্দোগ নেয়া যেতে পারে ৷

বজ্রপাতের সময় পারতঃপক্ষে বিদ্যুতের সংযোগ বন্ধ রাখা ও মোবাইল বা ল্যান্ড ফোন ব্যবহার হতে নগরবাসীকে বিরত রাখার জন্য ব্যাপক প্রচারনার প্রয়োজনও রয়েছে ৷ যে কোন মৃত্যুই বিয়োগান্তক দুঃখের৷ সরকারী উদ্দোগ ও মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি করে অপঘাতে মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনা অসম্ভব নয় ৷ বৈশ্বিক আবহাওয়া পরিবর্তনের কারনে সৃষ্ঠ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বজ্রপাতকে সরকার স্বীকৃতি দিলেও মানুষকে সচেতন করার কোন বিকল্প নেই, আর তাই বজ্রপাতে মৃত্যুর মিছিল বন্ধ হোক এই প্রত্যাশাই করি ৷

সংবাদটি শেয়ার করুন




Copyright © 2019 All rights reserved bengalreport24.com
Design BY NewsTheme