নির্মানাধীন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মাদকতার আখড়া

নির্মানাধীন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মাদকতার আখড়া

১৮ মাসের প্রকল্প। ১১ বছরে শেষ হয়েছে মাত্র অর্ধেক। দেখভালের অভাবে নির্মিতব্য ভবনগুলোর বহিরাংশ ফাঙ্গাস আর পরগাছায় ছেয়ে গেছে। স্থানে স্থানে দেখা দিচ্ছে ফাটল। ভিতরাংশ হয়ে উঠেছে অসামাজিক কর্মকান্ডের অভয়াশ্রম। কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৩১ থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ প্রকল্পের এহেন দশায় সেবা প্রদানকারী ও গ্রহণকারীদের আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, নির্মিতব্য ৪টি ভবন। হাসপাতাল সীমানার উত্তর প্রান্তে নার্স ও তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারি কোয়ার্টার। আগাছা আর ফাঙ্গাসে জবুথবু। পেছনের দিকে বড় মাপের একাধিক ফাটল। ভিতরে ঢুকতে উৎকট গন্ধ। অসমাপ্ত মেঝের নানা স্থানে শেয়ালের গর্ত আর পায়খানা। নাক-মুখ বন্ধ করে নিরাপত্তা বেষ্টনীহীন সিঁড়ি ভেঙ্গে দু’তলা। দরজা-জানালার বালাই নেই। পরিত্যক্ত পলিথিন, বোতল, পেস্টিংয়ের (ড্যান্ডি) কৌটাসহ গঁাজা ও ইয়াবা সেবনে ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি ছড়ানো-ছিটানো।

পাশের সড়ক থেকে পরিচিত একজন ডেকে জানতে চায়, “নেশা ভবনে” কী প্রয়োজনে! তার কাছে নামকরণের কারণ জানতে চাইলে হাসপাতাল সংলগ্ন গ্রামের ঈশিন জানান, এই ভবনটি নেশাখোরদের দখলে। নীচতলায় পথচারীদের জরুরি প্রাকৃতিক কর্ম সম্পাদন ও দু’তলায় নেশার রাজ্য বলে “নেশা ভবন” হিসাবে ভবনটি জনশ্রুত। নেশা ও অসামাজিক কার্যকলাপে যোগ দেয় বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ।
নিকটবর্তী মাইজহাটি গ্রামের আবদুল জলিল, সাদির মিয়া সামনের একই অবস্থার ডাক্তার কোয়ার্টার সম্পর্কে জানান, এটি জুয়াড়িদের দখলে। অন্যটি দেহ ব্যবসায়ীদের দখলে। ভবন দু’টির ভিতরের পরিবেশ তথ্য দাতাদের সত্যায়ন করে। প্রকল্পের মূল ভবনেরও একই দশা। জানান পাশের মার্কেট মালিক হাসান আলী।

তিনি আরও বলেন, মাঝে মধ্যে পুলিশের টহলের কারণে এখন অপরাধিদের দৌরাত্ম কিছুটা কমলেও পরবতর্ীতে আবার আগের অবস্থাই বহাল থাকে। হাসপাতালে সেবা নিতে আসা অনেকেই এসব অপরাধীদের শিকার হয়েছেন। চলমান স্বাস্থ্য সেবার ৩১ শয্যার আবাসিক ভবনের ছাদের শেডেও দেখা মিলে নিয়মিত ইয়াবা আড্ডার আলামত।

হাসপাতালে কমর্রত ওয়ার্ড বয় বয়ান হোসেন বলেন, নাই সীমানা প্রাচীর, নির্মিতব্য ভবনগুলিও রক্ষণাবেক্ষণহীন। নানা অপরাধীদের আখড়া। প্রায়শই চুরির ঘটনা ঘটছে। আবাসিক কর্মচারীরা আতঙ্কে দিনাতিপাত করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারি জানান, নিরাপত্তা ও বাসস্থান সুবিধার অভাবে ডাক্তারও এখানে আসতে চান না। বাধ্য হয়ে কাউকে বদলি করলেও কর্মক্ষেত্রে অনিয়মিত।

নিকলী উপজেলা পরিষদের নব দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান মো. রুহুল কুদ্দুস ভঁূইয়া জনি ও ভাইস চেয়ারম্যান রিয়াজুল হক আয়াজ এই প্রতিনিধিকে জানান, কিশোরগঞ্জ-৫ (নিকলী-বাজিতপুর) আসনের এমপি মহোদয় আলহাজ্ব আফজাল হোসেন বেশ কিছুদিন আগে এ সংক্রান্ত একটি ডিও লেটার পাঠিয়েছেন। বিভিন্ন সভায়ও বিষয়টি উপস্থাপন করা হচ্ছে। শীঘ্রই রি-টেন্ডার দিয়ে আরও ২টি নতুন বিল্ডিংসহ নতুন ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজ শুরু করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আমাদের আশ্বস্ত করেছেন।

উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে সারা দেশের বেশ কয়েকটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। নিকলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ কাজের দায়িত্ব পায় মেসার্স কাজল বিল্ডার্স, ২৯০/১ সোনারগাঁও রোড, হাতিরপুল, ঢাকা নামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। মূল হাসপাতাল ভবন ছাড়া দু’তলা বিশিষ্ট ৩টি কোয়ার্টার নির্মাণে প্রাক্কলিত দর ধরা হয় ৫ কোটি ১৪ লক্ষ ৩৬ হাজার টাকা। কার্যাদেশ নং-১১২/ তাং- ১৯/০৮/২০০৮ ইং। কার্যাদেশ চুক্তিমূলে ২০০৮ সালের ১৩ অক্টোবরে শুরু হয়ে ২০১০ সালের ১২ এপ্রিলের মধ্যে ভবন নির্মাণসহ আনুষাঙ্গিক কাজ সমাপ্তির কথা।

ঠিকাদার কাজ শুরু থেকেই নানা অনিয়মে জড়িয়ে যায়। ৪০% কাজ শেষ হবার আগেই উত্তোলন করা হয় ২ কোটি ৯০ লক্ষ টাকা। অজ্ঞাত কারণে বন্ধ করা হয় কাজ। ২০১৩ সালে মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের নিকলীতে আগমন উপলক্ষে ফাটল আর ছেয়ে যাওয়া ফাঙ্গাসের ওপর তড়িঘড়ি করে শেষ করা হয় প্রায় ৬০% কাজ। তারপর থেকে দেখা নেই নির্মাণ প্রতিষ্ঠান মেসার্স কাজল বিল্ডার্সের কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির।

সংবাদটি শেয়ার করুন




Copyright © 2019 All rights reserved bengalreport24.com
Design BY NewsTheme