চাঁদাবাজের সঙ্গ দিচ্ছেন ডিবি’র পরিদর্শক এনাম!

কি পরিমাণ সম্পদ আছে তার কোন হদিস নেই। হেলিকপ্টর নয়তো বিমান এর মধ্যে যেকোন একটি দিয়েই নিয়মিত গ্রামের বাড়ীতে অবতরণ করে সে। বৈধ আয়ের উৎস নেই, তবে কথিত রয়েছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একজন প্রভাবশালী তথ্য দাতা (সোর্স) হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। নিজ জন্মস্থান গ্রামের বাড়ীতে তার রয়েছে বেশ কয়েকটি সুবিশাল অট্টালিকা। তাছাড়াও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় নামে ও বেনামে রয়েছে বহু সম্পত্তি। বেশ কয়েক বছর তার নামের আগে সোর্স ব্যবহার হলেও এখন চাঁদাবাজ হিসেবে বেশ খ্যাতি রয়েছে তার। নারায়ণগঞ্জের বৈধ-অবৈধ তেল সেক্টরে এক বাক্যেই তার নাম উচ্চারিত হয়। যখন যে পুলিশ সুপার নারায়ণগঞ্জে দায়িত্ব নেয় তার নাম ভাঙ্গিয়েই অবৈধ তেলের কারবারীদের কাছ থেকে নিয়মিত আদায় করেন অর্থ।

আলোচনা হচ্ছিল রাজশাহী দামকুড়া বেড়পাড়া গ্রামের মো. সামশের আলী ও মৃত বেদনা বেগমের ছেলে মো. আনসারুল হক ওরফে আনোয়ার হোসেনের সম্পর্কে। আনোয়ার জন্মসূত্রে রাজশাহী জেলার হলেও সে বর্তমানে রূপগঞ্জের গোলাকান্দাইল এলাকায় বসত গড়ে তুলেছে। কয়েক বছর আগেও নিজের ও পরিবারের ভরণ পোষনের জন্য গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যদের কাছে যার হাত পাততে হতো আজ সে অঢেল সম্পদের মালিক। যখন আনোয়ার গ্রামের বাড়ীতে যান কখনো হেলিক্টার আবার কখনো বিমানে করে ভ্রমণ করে। অবৈধ তেলের কালো টাকায় অল্প দিনেই আনোয়ার অর্জন করেছে অঢেল সম্পদ। অভিযোগ রয়েছে তার এই অঢেল সম্পত্তি উপার্জনের পিছনে গোয়েন্দা পুলিশের বেশ কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তাও জড়িত আছেন।

গেল বছর ১২ এপ্রিল রূপগঞ্জের বরপা এলাকায় বিভিন্ন পরিবহন থেকে বল প্রয়োগ করে চাঁদা উঠানোর অভিযোগে আনোয়ার হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছিল জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। এরপর একে একে তার বিরুদ্ধে হেফাজতের নাশকতার মামলাসহ অবৈধ তেল চুরি ও চাঁদাবাজীর আরো বেশ কয়েকটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ইতিপূর্বে সবকটি মামলা থেকে জামিনে মুক্ত হয়েছে আনোয়ার। সূত্র বলছে, জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় সেই অবৈধ তৈল চুরির সেক্টর থেকে পুলিশ সুপারের নাম ভাঙ্গিয়ে চাঁদাবাজীর উৎসব শুরু করেছে সে। তার এই অনৈতিক কাজে সর্বপরি সহযোগী হিসেবে গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের পরিদর্শক এনামুল হক ও উপ পরিদর্শক ইয়ায়ুর সম্পৃক্ত আছে এমনও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

সূত্রটি বলছে, রূপগঞ্জ নীলা মার্কেট, আড়াইহাজার হাইওয়ে ও সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার অবৈধ তেল কারবারীদের সাথে গভির সখ্যাতে রয়েছে আনোয়ারের। জামিনে মুক্ত হওয়ার পর কিছুদিন নিশ্চুপ থেকে আবার নতুন করে চাঁদাবাজির বাণিজ্য শুরু করে সে। কথতি রয়েছে পূর্বের যারা জেলা গোয়েন্দ (ডিবি) পুলিশে কর্মরত ছিল তারা কেউই এখন নারায়ণগঞ্জে কর্মরত নেই। কিন্তু আগের কথিত অসাধু কর্মকর্তারা না থাকলেও নতুন সঙ্গি খুঁজে নিতে সময় লাগেনি তার। অবৈধ তলের রমরমা বাণিজ্যে এবার আনোয়ারের নতুন সঙ্গী পুলিশ পরিদর্শক এনামুল হক এমন অভিযোগ বেশ কয়েকটি সূত্রে পাওয়া গেছে। পরিদর্শক এনামুল হক গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশে যোগদানের পর তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন মামলার বাদী ও বিবাদীদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এমন সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে স্থানীয় পত্রিকায়।

অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করলে পুলিশ পরিদর্শক এনামুল চাঁদাবাজ আনোয়ারকে চিনেন বলে নিশ্চিত করেছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুলিশ সুপার কিংবা আমার নাম ভাঙ্গিয়ে আনোয়ার তেল সেক্টর থেকে টাকা উঠিয়ে থাকে তাহলে এই বিষয়ে পুলিশ সুপারের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি। একই সংস্থার এসআই ইয়ায়ুর অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, তিনি আনোয়ার নামের কাউকে চিনেননা। এছাড়াও তিনি পরিদর্শক এনামের জোনে নয়, তিনি পরিদর্শক ফখরুল ইসলামের জোনে কর্মরত আছেন।

আড়াইহাজারের কালাপাহাড়িয়া এলাকায় জোসনা বেগম নামের এক গৃহবধু তার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে এমন অভিযোগে ২০২০ সালের ২৩ জুলাই নারায়ণগঞ্জ আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন। স্পর্শকাতর মামলাটির তদন্ত দায়িত্ব পায় ডিবি পুলিশের পরিদর্শক এনামুলক হক। জোসনা বেগমের স্বামীকে গুলি করা হয়েছিল এবং তার স্বামী হত্যাকারীদের কারনে বিনা চিকিৎসায় নিজ বাড়ীতে মৃত্যু করেন। পরে স্থানীয় একটি কবরস্থানে স্বামীর মরদেহ দাফন করা হয় জানিয়ে জোসনা বেগম স্বামীর মরদেহ কবর থেকে তুলে ময়না তদন্তের জন্য আবেদন করলে আদালত তাতে সারা দিয়ে লাশ উত্তোলন করে ময়না তদন্তের নির্দেশ দেন। এরপর ডিবির পরিদর্শক এনামুল হক ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে কবর থেকে জোসনা বেগমের স্বামীর লাশটি উঠিয়ে ময়না তদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। কিন্তু লাশটি স্বামীর নয় সেখানে উপস্থি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জোসনা বেগম আর্জি জানালে কর্তব্যরত ম্যাজিস্ট্রেট লাশটির ডিএনএ প্রোফাইলিংক করে সংশ্লিষ্ট স্বজনের ডিএনএ এর সাথে মিলিয়ে নিতে তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে ময়না তদন্তে লাশটির সঠিক মৃত্যু কিংবা গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে এমন মতামত পাওয়া যায়নি এবং মৃত দেহটির সাথে জোসনা বেগমের শ^শুরের ডিএনএ এর সাথে মিলও পাওয়া যায়নি। এরপর তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক এনামুল হক হত্যা মামলাটি একটি মিথ্যা মামলা মতামত দিয়ে গেল বছর ২৭ মে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন মিথ্যা দাখিল করেন (চূড়ান্ত রিপোর্ট নং-৭) এবং সেই সাথে মিথ্যা মামলা করার দায়ে বাদী জোসনা বেগমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আদালতে লিখিত দেন।

আসামীদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে নিশ্চিত হত্যা মামলাটিকে একটি মিথ্যা মামলায় রূপান্তর করেছে পরিদর্শক এনামুল হক এমন অভিযোগ জোসনা বেগমের। তিনি জানান, হত্যা মামলাটি মিথ্যা সেটির কিভাবে নিশ্চিত হয়েছে পরিদর্শক এনামুল হক। যে লাশটি কবর থেকে উঠিয়ে ময়ানা তদন্ত করা হয়েছে সেই লাশের ডিএনএ এর সাথে স্বামীর বাবা অর্থাৎ জোসনার শ^শুরের ডিএনএর সাথে মিল পাওয়া যায়নি। যেখানে মযনা তদন্ত হওয়া লাশটি জোসনা বেগমের স্বামী সেটি নিশ্চিত হওয়া যায়নি সেখানে পরিদর্শক এনামুল মামলটি মিথ্যা এমন প্রতিবেদন কিভাবে আদালতে জমা দিয়েছেন তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অপর দিকে স্থানীয় একটি পত্রিকায় ‘এসপির নামে ডিবি পরিদর্শক এনামুলের বাণিজ্য’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদটিতে বলা হয় নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপারের নাম ভাঙ্গিয়ে বিভিন্ন জনকে হয়রানির হুমকি দিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ পুলিশের পরিদর্শক এনামুল কবিরের বিরুদ্ধে। মামলা দিয়ে হয়রানি, রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনের হুমকি দিয়ে এবং মামলার অভিযোগপত্র থেকে নাম বাদ দেওয়ার কথা বলে ইতোমধ্যে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ডিবির এই কর্মকর্তা। এমনকি রূপগঞ্জ উপজেলার একটি ইউপি নির্বাচনের প্রার্থীকে বিজয়ী করার আশ্বাস দিয়েও মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ পরিদর্শক এনামুল কবিরের বিরুদ্ধে। চোরাই তেল সিন্ডিকেট ও মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও তিনি নিয়মিত মাসোহারা আদায় করছেন। এছাড়াও রূপগঞ্জে সাংবাদিকের ছেলে খুন, সোনারগাঁ বালু ব্যবসায়ে আধিপত্য নিয়ে জোড়া খুন, রয়েল রিসোর্টে হেফাজতের তান্ডব মামলাগুলোকে পুজি করে জেলা পুলিশ সুপারের নাম ভাঙ্গিয়ে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

এমন অভিযোগের বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার মো. জায়েদুল আলম সংবাদচর্চাকে বলেন, শুধু এনামুলই নয়, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে যারা জড়িত তাদের সকলের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, যে সকল চাঁদাবাজ পুলিশের নাম ভাঙ্গিয়ে অবৈধ তেল বাণিজ্যের সাথে জড়িত তাদের বিরুদ্ধেও দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।